খুলনা প্রতিনিধি:
খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের (ডিসি ফুড) কার্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্য দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও কার্যকর শাস্তির কোনো নজির দেখা যাচ্ছে না। অভিযোগ ওঠার পর অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা বা বরখাস্তের পরিবর্তে শুধু বদলি করে দায় সারা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে সরকারি খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা দিন দিন কমে যাচ্ছে, বাড়ছে ক্ষোভ ও হতাশা।
সরকারি খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা, ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস), খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং সরকারি গুদাম ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে খুলনা খাদ্য বিভাগে। স্থানীয় ডিলার, মিল মালিক ও সাধারণ জনগণের অভিযোগ অনুযায়ী, এসব অনিয়ম বছরের পর বছর ধরে চললেও দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ঘুষ-কমিশন বাণিজ্য ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ
দৈনিক স্বাধীন সংবাদ-এর অনুসন্ধানে জানা গেছে, খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক (আরসি ফুড) ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ডিসি ফুড) কার্যালয়ে ঘুষ, কমিশন বাণিজ্য, ডিলার নিয়োগে সিন্ডিকেট, চাল-আটা বিতরণে অনিয়ম এবং ভুয়া চালানের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অভিযোগকারীরা বলছেন, এসব অনিয়ম প্রকাশ্যেই সংঘটিত হলেও কার্যত কেউ দায়িত্ব নিচ্ছে না।
স্থানীয় ওএমএস ডিলাররা জানান, খাদ্যশস্যের বরাদ্দ পেতে এবং উত্তোলনের প্রতিটি ধাপে নির্দিষ্ট অঙ্কের ঘুষ দিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ডিলারের উপস্থিতি ছাড়াই চালান গ্রহণ করা হয় এবং পরে কাগজে-কলমে পণ্য বিতরণ দেখানো হয়। এতে প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।
বদলি হলেও আইনি ব্যবস্থা নেই
সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে খুলনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কাজী সাইফুদ্দিন এবং আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক ইকবাল বাহার চৌধুরীসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগের ভিত্তিতেই এসব বদলি হয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো—বদলি ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা, বিভাগীয় শাস্তি বা বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
এ কারণে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে, বদলি হয়ে অন্য জায়গায় গিয়ে এসব কর্মকর্তা আবারও একই ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন কি না।
ওএমএস ও গুদাম ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম
একাধিক সূত্র জানায়, খুলনায় ওএমএস কর্মসূচিতে ব্যাপক অনিয়ম রয়েছে। সরকারি গুদাম থেকে চাল ও গম সরবরাহে মিল মালিকদের সঙ্গে যোগসাজশ করে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের অভিযোগও উঠেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি খাদ্যশস্য কালোবাজারে চলে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তাদের সুপারিশ বাস্তবায়নের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে পরিস্থিতির বাস্তব কোনো উন্নতি হচ্ছে না।
ডিলারশিপ পেতে টাকা, না দিলে হয়রানি
খুলনা খাদ্য অফিসে একটি শক্তিশালী দুর্নীতির সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে নিয়মিত চাল বরাদ্দ নেওয়া হচ্ছে। এতে প্রকৃত ও যোগ্য ডিলাররা বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্থানীয় ডিলাররা জানান, লাইসেন্স নবায়ন, নতুন ডিলারশিপ পাওয়া কিংবা বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়।
দুদকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) খুলনা কার্যালয়ে এসব অভিযোগ জমা পড়লেও ব্যবস্থা গ্রহণের গতি অত্যন্ত ধীর বলে অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তদন্ত চলমান থাকলেও তার অগ্রগতি বা ফলাফল প্রকাশ্যে আসছে না। এতে জনগণের মধ্যে ধারণা জন্মেছে, খাদ্য বিভাগে দুর্নীতি যেন একটি ‘স্বাভাবিক প্রক্রিয়া’তে পরিণত হয়েছে।
সচেতন নাগরিকদের দাবি
সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, শুধু বদলি করে দায় এড়ানো যাবে না। দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনি ব্যবস্থা, বরখাস্ত এবং অর্থ আত্মসাতের ক্ষেত্রে ফৌজদারি মামলা করতে হবে।
তারা আরও বলেন, খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা স্বচ্ছ করতে ডিজিটাল মনিটরিং, নিয়মিত পরিদর্শন, তৃতীয় পক্ষের অডিট এবং কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় সরকারের খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ।
শুধু খুলনা নয়, সারাদেশের চিত্র
খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এই চিত্র শুধু একটি জেলার নয়, বরং সারাদেশের খাদ্য বিভাগের বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ না নিলে এই দুর্নীতির চক্র ভাঙা সম্ভব হবে না।
জনগণের প্রত্যাশা, দ্রুততম সময়ের মধ্যে দোষীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং খাদ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনা হবে।