এস আলম গ্রুপের ১১ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা, চাকরি হারালেন সাড়ে ৪ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী

কামরুল ইসলাম:

দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন ১১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের ছাঁটাইয়ের নোটিশ বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) প্রদান করা হয় এবং শনিবার (১ আগস্ট) থেকে তা কার্যকর হয়েছে। এর ফলে একসঙ্গে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন, যা দেশের শিল্প খাতে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

জানা গেছে, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় অবস্থিত এস আলম গ্রুপের এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন সংকট ও কাঁচামালের অভাবে সীমিত পরিসরে পরিচালিত হচ্ছিল। সর্বশেষ আর্থিক ও ব্যাংকিং জটিলতার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কারখানাগুলোর নিরাপত্তা ও বৈদ্যুতিক বিভাগে কর্মরত অল্পসংখ্যক কর্মী এখনো দায়িত্ব পালন করছেন, যাতে কারখানার যন্ত্রপাতি ও স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।

এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের প্রকৌশলী হাসমত আলী দৈনিক স্বাধীন সংবাদ ও দৈনিক বাংলাদেশ পত্রিকাকে বলেন, “বৃহস্পতিবার থেকে ছাঁটাইয়ের নোটিশ দেওয়া শুরু হয়। শনিবার থেকে তা কার্যকর হয়েছে। মোট ১১টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে।”

বন্ধ ঘোষণা করা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—

  • এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড
  • এস আলম সিমেন্ট
  • এস আলম অয়েল
  • এস আলম ভেজিটেবল অয়েল
  • এস আলম ব্যাগ ফ্যাক্টরি
  • চেমন ইস্পাত লিমিটেড
  • এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেড
  • এস আলম স্টিল
  • এস আলম পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড
  • এস আলম পাওয়ার জেনারেশন লিমিটেড
  • পশুখাদ্য উৎপাদনকারী একটি প্রতিষ্ঠান

তবে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় অবস্থিত এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ার প্ল্যান্ট (কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র) স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাবে বলে জানা গেছে।

বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠানগুলোতে টাঙানো ছাঁটাইয়ের নোটিশে উল্লেখ করা হয়, “ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী তালিকাভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো, যা ১ আগস্ট থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে।”

প্রকৌশলী হাসমত আলী আরও জানান, দুই বছর আগেও এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় আট হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে জনবল কমানো হয়। সর্বশেষ প্রায় সাড়ে চার হাজার কর্মী কর্মরত ছিলেন, যাদের সবাইকে ছাঁটাই করা হয়েছে। চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আগে তাদের বেতন, ভাতা এবং অন্যান্য আইনানুগ পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, গত দুই বছর ধরে কারখানাগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে উৎপাদনে না থাকলেও কর্মীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ হয়ে যাওয়া এবং নতুন করে লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খুলতে না পারায় বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি সম্ভব হয়নি। ফলে উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

হাসমত আলী জানান, মালিকপক্ষ আশাবাদী যে, ভবিষ্যতে ব্যাংকিং ও আর্থিক জটিলতা কাটিয়ে কারখানাগুলো পুনরায় চালু করা সম্ভব হলে বর্তমান ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনরায় কাজে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।

একযোগে ১১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে কয়েক হাজার শ্রমিক ও তাদের পরিবারের জীবিকা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ায় বিষয়টি নিয়ে শ্রমিক মহল ও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *